ব্রেস্ট ক্যান্সার: নারীদের জন্য নীরব এক ঘাতক
বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত ক্যান্সার হলো ব্রেস্ট ক্যান্সার। প্রতিবছর প্রায় ২.৩ মিলিয়ন নারী এতে আক্রান্ত হয়ে ৬.৮৫ লাখ মৃত্যুবরণ করেন। ২০২৩ সালে এটি ফুসফুস ক্যান্সারকে ছাড়িয়ে বিশ্বের শীর্ষ ক্যান্সার হয়েছে। উন্নত দেশে সচেতনতা ও চিকিৎসা থাকলেও বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার নারী আক্রান্ত হন এবং দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ায় মৃত্যুহার উদ্বেগজনকভাবে বেশি।
ব্রেস্ট ক্যান্সারের লক্ষণ
ব্রেস্ট ক্যান্সারের কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো-
- স্তনে শক্ত বা ব্যথাহীন গিট অনুভব করা
- বগলের নিচে ফোলা বা গিঁট
- স্তনের আকার, আঙ্গিক বা রঙে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
- স্তন বা বোঁটার ত্বকে ভাঁজ, গর্ত বা খোসা ওঠা
- বোঁটা থেকে রক্ত বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক সাব
- স্তনের ত্বক লালচে, গরম বা ফোলা হয়ে যাওয়া
প্রাথমিক পর্যায়ে এই লক্ষণগুলো হালকা হতে পারে এবং অনেক নারী তা উপেক্ষা করেন। কিন্তু সময়মতো পরীক্ষা না করলে রোগ দ্রুত অগ্রসর হয়।
ঝুঁকির কারণসমূহ ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি বিভিন্ন কারণে বাড়তে পারে। এর মধ্যে কিছু পরিবর্তনযোগ্য, কিছু আবার জন্মগত বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
১. বয়স – বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ে।
২. পারিবারিক ইতিহাস- মা, বোন বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের কারো ব্রেস্ট ক্যান্সার থাকলে ঝুঁকি অনেক বেশি।
৩. জেনেটিক মিউটেশন- বিশেষ করে BRCA1 ও BRCA2 জিনে পরিবর্তন হলে ঝুঁকিবহুগুণ বেড়ে যায়।
৪. হরমোনাল কারণ- কম বয়সে ঋতুস্রাব শুরু হওয়া বা দেরিতে মেনোপজ হওয়া।
৫.সন্তান জন্মদান- দেরিতে সন্তান জন্ম দেওয়া বা সন্তান না হওয়া ঝুঁকি বাড়ায়।
৬. স্তন্যপান না করানো- স্তন্যপান ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
৭. অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন- স্থূলতা, ব্যায়ামের অভাব, ফাস্টফুড বেশি খাওয়া।
৮. ধূমপান ও মদ্যপান- ক্যান্সারের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ।
প্রতিরোধ ও সচেতনতা
ব্রেস্ট ক্যান্সার পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও গবেষণায় দেখা গেছে-সচেতনতা, জীবনধারার পরিবর্তন ও নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্যান্সার এড়ানো যায়।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস (শাক-সবজি, ফল, আঁশযুক্ত খাবার বেশি; ফাস্টফুড ও প্রসেসড ফুড কম)
- ওজন নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যায়াম।
- ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা।
- ১ শিশুকে অন্তত ৬ মাস বুকের দুধ খাওয়ানো।
মাসে একবার ব্রেস্ট সেলফ-এক্সামিনেশন (BSE)
- বছরে অন্তত একবার ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন (CBE)।
- ৪০ বছরের পর নিয়মিত ম্যামোগ্রাফি, তরুণ নারীদের ক্ষেত্রে আল্ট্রাসাউন্ড।
সঠিক চিকিৎসা ও ফলো-আপ।
- পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধে জীবনধারা পরিবর্তন।
- মানসিকস্বাস্থ্য সহায়তা।
চিকিৎসা
ব্রেস্ট ক্যান্সারের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগ কোন পর্যায়ে শনাক্ত হয়েছে তার উপর। বর্তমানে ব্যবহৃত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো-
১. সার্জারি (অস্ত্রোপচার): টিউমার বা পুরো স্তন অপসারণ।
২. কেমোথেরাপি: ওষুধের মাধ্যমে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা।
৩. রেডিওথেরাপি: উচ্চ-শক্তির রশ্মি ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস।
৪. হরমোন থেরাপি: হরমোন নির্ভর ক্যান্সারের ক্ষেত্রে কার্যকর।
৫. টার্গেটেড থেরাপি: বিশেষ ওষুধের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ক্যান্সার কোষ ধ্বংস।
৬. ইমিউনোথেরাপি: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই।
বাংলাদেশে এখন অনেক হাসপাতাল ও ক্যান্সার সেন্টারে আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। তবে চ্যালেঞ্জ হলো-সময়মতো রোগীকে শনাক্ত করা এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা।
আজকের দিনে ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ে ভয় নয়, বরং সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের প্রধান দায়িত্ব। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ- “একজন নারীর জীবন বাঁচানো মানে একটি পরিবারকে বাঁচানো।”
ব্রেস্ট সেলফ এক্সামিনেশন (Breast Self-Examination)
নিজে নিজের স্তন পরীক্ষা করার পদ্ধতিকে ব্রেস্ট সেলফ এক্সামিনেশন বলে।
কোন বয়স থেকে BSE করা উচিৎ?
২০ এবং তদুর্ধ্ব বয়সের সকল মহিলাদের নিয়মিত BSE করা প্রয়োজন।
কোন সময় BSE করা উচিৎ?
- সাধারণত ঋতুস্রাব বন্ধের পরবর্তি সপ্তাহে প্রতিমাসের একটি নির্ধারিত দিনে BSE করা উচিৎ।
- যাদের মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে অথবা গর্ভকালীন সময়ে একইভাবে মাসের একটি নির্ধারিত দিনে BSE করা যেতে পারে।
BSE করার সময় নিম্নোক্ত পরিবর্তনগুলোর দিকে লক্ষ্য করুন
- স্তনে বা বগলে চাকা দৃশ্যমান হওয়া (thick mass) » স্তনের ত্বকে/চামড়ায় পরিবর্তন খাঁজ পড়া (indentation) > ক্ষয় হওয়া (erosion)
- লাল হয়ে যাওয়া বা গরম অনুভব করা (redness or heat)» স্তনের ত্বক কমলালেবুর খোসার মত পুরু হয়ে যাওয়া (orange peel skin)
- টোল পড়া বা ছোট ছোট গর্ত দেখা দেওয়া (dimpling)» বাড়তি অংশ বের হওয়া (bump) »> শিরা উপশিরা ফুলে যাওয়া (growing vein)
- স্তনবৃন্তের (Nipple) পরিবর্তন স্তনবৃত্ত ডেবে যাওয়া (retracted nipple) কোন কারণ ব্যতীত স্তনবৃন্ত থেকে তরল রক্ত বা পুঁজ বের হওয়া (new fluid)
- স্তনের আকার/আকৃতির অস্বাভাবিক পরিবর্তন (unusual changes in shape/size) » স্তনের ভিতরে অদৃশ্যমান চাকা অনুভব করা (invisible lump)
কোন অংশটুকু পরীক্ষা করব?
ছবিতে দৃশ্যমান পুরো জায়গা জুড়ে BSE করা উচিত। (Area starts from the collarbone to the sternum and then to the last rib of the chest cage)

BSE করার পদ্ধতি

মনে রাখবেন, BSE করার সময় ছবিতেনির্দেশিত এই ৩টি আঙ্গুলের চিহ্নিত অংশের মাধ্যমে আপনার স্তনের অস্বাভাবিকতা নির্ণয় করা জরুরী।
BSE ধাপসমূহ
১ম ধাপঃ খেয়াল করুন
স্তনের স্বাভাবিক অবস্থার কোন পরিবর্তন আছে কিনা লক্ষ্য করুন এবং উল্লেখিত ধাপ অনুযায়ী বিভিন্ন অবস্থানে (position)আকার-আকৃতির পরিবর্তন খেয়াল করুন।
১। হাত কোমরে রাখুন
২। হাত দুটি উপরে উঠিয়ে মাথার উপরে নিন
৩। কোমরে হাত দুটি একটু জোরে চেপে ধরে সামনের দিকেঝুঁকে বুকের মাংসপেশী সমূহকে আটসাট করুন
৪। নিপল আলতোভাবে চেপে দেখুন কোন তরল জাতীয় দ্রব্য নির্গত হয় কিনা

২য় ধাপঃ স্পর্শের মাধ্যমে অনুভব করুন
১। শুয়ে পড়ন, কাঁধের নীচে একটি বালিশ রাখুন এবং হাতের ২য়, ৩য় ও ৪র্থ আঙ্গুলের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে আলতোভাবে তারপর মাঝারি ধরনের এবং পরবর্তীতে
একটু দৃঢ় চাপেরমাধ্যমে স্তনের প্রতিটি অংশ অনুভব করুন।
২ । স্তনের বাইরের প্রান্ত থেকে বৃত্তাকার গতিতে ঘড়ির কাটার বরাবর অথবা একটি রেখার উপর-নীচ বিবেচনাকরে অথবা স্তনের বাইরের প্রান্ত থেকে অনুভব করে
ভিতরের স্তনবৃন্তের (Nipple) দিকে এবং Nipple থেকে পুনরায়বাইরের প্রান্ত পর্যন্ত অনুভব করুন।

নিন্মোক্ত ৩টি পদ্ধতিতে BSE সম্পন্ন করুন

মনে রাখবেন
স্তনের যে কোন পরিবর্তনই ক্যান্সার নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চাকা/পিন্ড সাধারন হয়ে থাকে। ব্রেস্ট সেলফ এক্সামিনেশন কে আপনার নিয়মিত অভ্যাসে পরিনত করুন, কারণ আপনার, আমার, আমাদের সচেতনতাই পারে সঠিক সময়ে স্তনক্যান্সার নির্ণয় করে মৃত্যুর ঝুঁকি কমিয়ে আনতে।

ডা. সৈয়দ আফতাব উদ্দিন
ডা. সৈয়দ আফতাব উদ্দিন একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ সার্জন, যিনি সাধারণ, ল্যাপারোস্কোপিক ও স্তন সার্জারিতে বিশেষজ্ঞ। তিনি সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন এবং বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের চিকিৎসক। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) থেকে সার্জারিতে এমএস ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবাসিক সার্জন (সার্জারি) হিসেবে কর্মরত আছেন এবং পার্কভিউ হাসপাতালে সার্জারি বিশেষজ্ঞ হিসেবে সেবা প্রদান করছেন। সাধারণ সার্জারি, ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি এবং স্তনক্যান্সার রোগের চিকিৎসায় তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি ও রোগীদের প্রতি নিবেদিত মনোভাবের মাধ্যমে তিনি তার খ্যাতি অর্জন করেছেন এবং রোগীদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা প্রদান নিশ্চিত করেন।

informative. sir k kivabe dekhate pari?